কাহিনীর জন্য চরিত্র গঠন করতে গেলে আমাদের তাদের বৈশিষ্ট্য আর ব্যক্তিত্ব নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে হবে। চরিত্রদের মধ্যে যেন গভীরতা থাকে। পাশাপাশি এদের মধ্যে কিছু শক্তিশালী দিক ও কিছু খামতি থাকবে। এই বৈশিষ্ট্যগুলি তাদের পাঠকের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলবে এবং পাঠক সহজেই তাঁদের সাথে নিজেদের মেলাতে পারবেন।
→ বিষয়টি সহজে বোঝার জন্য চলুন আমরা প্রথমে একটি প্লট আইডিয়া নিই এবং গল্পে চরিত্ররা কেমন হবে তার পরিকল্পনা করি।
একটি ছেলে তার বেস্ট ফ্রেন্ডের প্রেমে পড়ে। কিন্তু সে বুঝতে পারছে না যে মনের কথা জানালে তাদের বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে যাবে কি না।
এখানে গল্পের মূল চরিত্রদের প্রাথমিক বৈশিষ্ট্য কেমন হতে পারে?
1. দীপ্ত, আমাদের গল্পের মুখ্য পুরুষ চরিত্র। দীপ্ত হয়তো এমন কেউ যে পরিবারের সাথে থাকতে বেশি সময় কাটাতে পছন্দ করে না, বা সে ভীষণ বাচাল অথবা লাজুক। আমাদের কাহিনীর অনুযায়ী কোন ধরণের ব্যক্তিত্ব দীপ্তের সাথে সবথেকে ভালো মানাবে?
2. আমাদের গল্পে দীপ্ত শ্রুতিকে ভালোবাসে। কিন্তু শ্রুতি ওর অনুভূতির কথা শুনে কীভাবে রিঅ্যাক্ট করবে তা নিয়ে দীপ্ত নিশ্চিত নয়। এই পরিস্থিতিতে দীপ্ত যদি সাধাসিধে, শান্ত কিন্তু একজন ভালো অবজারভার হয় তাহলে কাহিনীতে এই চরিত্রকে আরও বেশি বাস্তবসম্মত বলে মনে হবে।
3. একইভাবে, শ্রুতি যদি খুব ওপেন-মাইন্ডেড হয়, তবে তাকেও খুব রিয়েল লাগবে। কারণ পরবর্তীতে শ্রুতি অন্য একটি ছেলের জন্য দীপ্তের সাথে বন্ধুত্ব ভেঙে দেবে। তাই শ্রুতি যদি চঞ্চল প্রকৃতির হয়, তবে সে দীপ্তের সাথে কতটা রূঢ় আচরণ করতে পারে, আমরা স্পষ্টভাবে দেখাতে পারব।
4. আমরা দেখাতে পারি, শ্রুতির এই চঞ্চলতা ও খোলামেলা স্বভাব দীপ্ত কেন পছন্দ করছে। আবার দীপ্তকে মিস করার সময় শ্রুতি কীভাবে দীপ্তের কেয়ারিং স্বভাবের কথা ভাবছে।
ঠিক এইভাবেই গল্পে চরিত্রদের ডেভেলপ করতে হবে, যাতে পাঠক মূল চরিত্রদের সাথে নিজেকে কানেক্ট করতে পারেন।
এবার বিস্তারিতভাবে দেখে নেওয়া যাক এই কাজ আপনি কীভাবে করবেন:
- 1
আপনার চারপাশের মানুষদের মধ্যেই চরিত্রদের খুঁজুন
আপনি আপনার আশেপাশে থাকা আকর্ষণীয় মানুষদের কথা ভাবলে মনে রাখার মতো চরিত্র তৈরি করা কঠিন বলে মনে হবে না। (যেমন - আপনার পরিবারের সদস্য, বন্ধুবান্ধব, পরিচিত লোকজন কিংবা শত্রু।)
- 2
চরিত্রের শারীরিক বৈশিষ্ট্য ঠিক করুন
চরিত্রের শারীরিক বৈশিষ্ট্য কেমন হবে, অর্থাৎ, তাদের উচ্চতা, চুলের রঙ, মুখের গড়ন, পোশাক-আশাক ইত্যাদি কেমন হবে বর্ণনা করুন। এই ধরণের বিবরণ আপনার এবং পাঠকের মনে চরিত্রের একটা ভিজ্যুয়াল ইমেজ তৈরি করে এবং পাঠক তাকে কীভাবে দেখছেন বুঝতে সাহায্য করে।
- 3
চরিত্রের স্বভাবের খুঁটিনাটি ঠিক করুন
ম্যানারিজম হলো ছোট ছোট আচরণ বা অভ্যাস যা একটি চরিত্রের মধ্যে থাকে। এগুলো চরিত্রের ব্যক্তিত্ব এবং মানসিক অবস্থা সম্পর্কে অনেক তথ্য পাঠকদের দেয়। যেমন - কোনো চরিত্র যদি খুব টেনশন করে, সে হয়তো ছটফট করবে বা নখ কাটবে।
- 4
চরিত্রের অভ্যাস ও দৈনন্দিন রুটিন তৈরি করুন
অভ্যাস এবং রুটিনও একটি চরিত্রের ব্যাকগ্রাউন্ড ও ব্যক্তিত্ব প্রকাশ করে। চরিত্রটি সারাদিন কী করে এবং সেটা তার আচরণ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কেমন প্রভাব ফেলে, তা ভেবে দেখুন।
- 5
চরিত্রের শক্তি এবং দুর্বলতাগুলো স্পষ্ট করুন
প্রতিটি চরিত্রের মধ্যেই কিছু শক্তিশালী দিক ও দুর্বলতা থাকা উচিত। এটি চরিত্রে ভারসাম্য আনে এবং পাঠকদের কাছে তাকে আরও বাস্তবসম্মত করে তোলে।
- 6
চরিত্রের লক্ষ্য এবং মোটিভেশন ঠিক করুন
চরিত্রটি কী চায় এবং কেন চায়? চরিত্রের লক্ষ্য এবং মোটিভেশন বুঝতে পারলে তার আচরণ ও অ্যাকশনের কারণ সহজে বোঝা যায়।
- 7
ইউনিক এবং কনসিস্টেন্ট ব্যক্তিত্ব তৈরি করুন
প্রতিটি চরিত্রের নিজস্ব ব্যক্তিত্ব থাকা দরকার যা তাকে অন্যান্য চরিত্রদের থেকে আলাদা করবে। সমগ্র কাহিনী জুড়ে চরিত্রের ব্যক্তিত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি, যাতে পাঠক বুঝতে পারেন যে কোনো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে চরিত্রটি ঠিক কেমনভাবে রিঅ্যাক্ট করতে পারে।
- 8
বর্ণনামূলক শব্দ ও বাক্যাংশ ব্যবহার করুন
চরিত্রের ব্যক্তিত্ব বর্ণনামূলক শব্দ ব্যবহার করুন। উদাহরণস্বরূপ, যে চরিত্রটি খুব মিশুকে এবং বন্ধুত্বপূর্ণ, তার আচরণ স্বাভাবিকভাবেই একজন লাজুক ও মুখচোরা চরিত্রের থেকে আলাদা হবে।
- 9
মুখে না বলে কাজের মাধ্যমে দেখান (শো, ডোন্ট টেল)
চরিত্রের বৈশিষ্ট্য কেমন তা পাঠকদের সরাসরি বলে দেওয়ার চেয়ে, চরিত্রদের কাজকর্ম, কথাবার্তা এবং আচরণের মাধ্যমে এই বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করুন। এতে চরিত্ররা স্ক্রীন থেকে জীবন্ত হয়ে উঠে আসবে এবং পাঠকের কাছে অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হবে।
- 10
ধারাবাহিকতা বজায় রাখুন
একবার একটি চরিত্রের বৈশিষ্ট্য ঠিক করে নেওয়ার পর, সম্পূর্ণ গল্প জুড়ে তা বজায় রাখুন। পরবর্তীতে চরিত্রের মধ্যে কোনো পরিবর্তন বা বদল হলে তা যেন পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি এবং চরিত্রের নিজস্ব মানসিক বিকাশের ফল হিসেবে হয়।
- 11
চরিত্রকে গোপন রহস্য দিন
চরিত্রের কোনো গোপন রহস্যের কথা পাঠকদের জানিয়ে রাখলে পাঠকদের কাছে চরিত্রটির প্রতি একটা আবেগ তৈরি হয়। পাঠক হয়ত এমন কথা জানতে পারলেন যা চরিত্রের স্ত্রী বা বাবা-মা জানেন না! এটি পাঠকদের পরের পর্ব পড়ার জন্য ধরে রাখতে সাহায্য করবে। তাছাড়া, গোপন রহস্য থাকলে চরিত্ররা অনেক সময় অদ্ভুত আচরণ করে থাকেন, তারা সত্যি গোপন করতে মিথ্যার আশ্রয় নেন।
- 12
ব্যাকস্টোরি বা অতীতের গল্প
একটি চরিত্রের অতীত অভিজ্ঞতা তার বর্তমান আচরণ ও ব্যক্তিত্বকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে। তাই ভেবে দেখুন, চরিত্রের অতীতের কোন ঘটনা তাকে আজকের এই মানুষটায় পরিণত করেছে এবং ঘটনাগুলো তাকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে।
- 13
আপনার চরিত্রের কি কোনো গোপন আতঙ্ক আছে?
ভেবে দেখুন, গল্পের চরিত্রটির কি কোনো গোপন ভয়, গোপন ইচ্ছা, গোপন ভালোবাসা বা গোপন আবেগ আছে? চরিত্রটি কি এমন কিছু করেছে যা সে বাকিদের জানতে চায় না? তার অতীতে কি কোনো লজ্জাজনক ঘটনা আছে? তার নিজের কি এমন দিক আছে যা সে নিজেই পছন্দ করে না? সে কি এমন কেউ সেজে থাকার ভান করছে যা আসলে সে নয়?
- 14
চরিত্রের পারস্পরিক সম্পর্ক তৈরি করুন
একটি চরিত্র অন্য চরিত্রদের সাথে কীভাবে মিশছে, তা থেকে তার ব্যক্তিত্ব ও মোটিভেশন সম্পর্কে অনেক কথা বলে। চরিত্রটি কার সবথেকে কাছের, কার সাথে তার বিরোধ আছে এবং সেই সম্পর্কগুলো কাহিনীকে কীভাবে প্রভাবিত করছে, তা নিয়ে ভাবুন।
- 15
চরিত্রকে একটা ইউনিক ভয়েস বা কথা বলার ধরণ দিন
প্রতিটি চরিত্রের কথা বলা এবং চিন্তা করার নিজস্ব ধরণ থাকা উচিত। কথোপকথনের সময় তাদের শব্দ চয়ন, বাক্য গঠন এবং দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে এটা ফুটিয়ে তোলা সম্ভব।
- 16
চেনা ছকের বাইরে গিয়ে চরিত্র তৈরি করুন
হতেই পারে আপনার কলেজের সেই গম্ভীর প্রফেসর আসলে একজন এক্সপার্ট স্ট্রিট ফাইটার! কিংবা আপনার গল্পের সেই রাফ অ্যান্ড টাফ পুলিশ অফিসারটি আসলে রোমান্টিক উপন্যাস পড়তে ভালোবাসেন! অথবা কাহিনীর খলনায়ক বা নিষ্ঠুর চরিত্রটির হয়তো শিশু আর পশুপাখিদের প্রতি একটা সফট কর্নার আছে।
- 17
আকর্ষণীয় নাম বেছে নিন
চরিত্রের ব্যক্তিত্ব বা কাহিনীতে তার ভূমিকার কথা মাথায় রেখে নাম ঠিক করুন, যাতে নামেই তার ব্যক্তিত্বের প্রতিফলন ঘটে। যেমন - কোনো শক্তিশালী এবং সাহসী চরিত্রের নাম অভিমন্যু বা অর্জুন হতে পারে। তাই বিভিন্ন নাম নিয়ে ভাবনাচিন্তা করুন এবং স্থির করুন কোন নাম গল্পের চরিত্রটির সাথে সবথেকে ভালো মানাবে।
- 18
চূড়ান্ত বার্তা
বিভিন্ন চরিত্রের এত রকমের বৈশিষ্ট্য ও ব্যক্তিত্ব স্থির করা কঠিন মনে হলে একদম চিন্তা করবেন না! শুধু আপনার গল্পের মূল চরিত্রদের নিয়ে এই কাজ শুরু করুন এবং ভাবনা অনুযায়ী তাঁদের ইউনিক পরিচয় দিন।
চরিত্রের সমস্ত খুঁটিনাটি বৈশিষ্ট্যই যে গল্পে উল্লেখ করতে হবে এমনটা নয়। তবে লেখক হিসেবে আপনার মাথায় আইডিয়া পরিষ্কার থাকতে হবে, যাতে আপনি সেই অনুযায়ী চরিত্রদের অ্যাকশন, ডায়লগ এবং আচরণ লিখতে পারেন।
আপনার গল্পের চরিত্ররা যদি অসাধারণ হয়, পাঠক আপনার গল্পের সাথে জুড়ে থাকবেন। কারণ, সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা চরিত্ররাই গল্পকে সফলভাবে এগিয়ে নিয়ে যায়।
হ্যাপি রাইটিং!
— টিম প্রতিলিপি
